কম CGPA নিয়েও জার্মানি যাওয়ার বিস্তারিত জার্নি

সেয়ার: 0
জার্মানির একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের সামনে শিক্ষার্থীদের পথচলা

কম CGPA নিয়েও জার্মানি যাওয়ার বিস্তারিত জার্নি

ভিসা হাতে পেয়েছি ডিসেম্বরে। এতদিন ব্যস্ততার কারণে আমার পথচলা শেয়ার করতে পারিনি। বর্তমানে যে পরিস্থিতি এম্বাসিতে বিরাজ করছে, তাতে আমার এই জার্নিটি হয়তো কাউকে না কাউকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারবে।

জার্মানি যাওয়ার কথা যখন প্রথম ভাবি, তখন চারপাশের অনেকেই বলেছিলেন — এই CGPA দিয়ে পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি সম্ভব নয়, সময় নষ্ট করো না। আমি তাদের কথা শুনেছি, কিন্তু তাদের কথায় থামিনি। নিজে নিজে পার্সোনাল রিসার্চ শুরু করলাম। আজ যখন ভিসা হাতে আছে, তখন বিশ্বাস করতে পারি — CGPA শুধু একটা নম্বর মাত্র, আসল কথা হলো তুমি কতটা স্মার্টলি তোমার প্রোফাইল বিল্ড করতে পারছো এবং কতটা ধৈর্য ধরে সঠিক সময়ে সঠিক কাজটা করতে পারছো। নিচে আমার পুরো জার্নিটি ধাপে ধাপে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরছি।

ধাপ ১: নিজের হাতে কোর্স রিসার্চ — অ্যাপয়েন্টমেন্টের দিন থেকেই শুরু

অনেকের একটা ভুল ধারণা আছে যে কোর্স খোঁজা মানে শুধু DAAD-এ গিয়ে সার্চ দেওয়া। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলছে, এটা অনেক বেশি গভীর একটা প্রক্রিয়া। আমি তিনটি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছি — DAAD.de, MyGermanUniversity এবং StudyODA। এমন কোনো কোর্স নেই যেগুলো আমি খুঁজে দেখিনি। কিন্তু শুধু খুঁজে দেখলাম তো হলো না — প্রতিটি কোর্সের অফিসিয়াল পেজে গিয়ে Admission Requirement পড়েছি, কারিকুলাম দেখেছি, ফ্যাকাল্টি মেম্বারদের রিসার্চ এরিয়া দেখেছি।

একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় — আমি এমন কোর্সগুলোও দেখেছি যেগুলো আমার সাবজেক্টের সাথে সরাসরি রিলেটেড ছিলো না, কিন্তু কারিকুলামে আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে ম্যাচিং পয়েন্ট ছিলো। আরেকটা কথা পরিষ্কার করে বলি — আমি ডক্টর মেইল আসার দুই মাস আগে বা অ্যাপ্লাই সিজন শুরু হওয়ার আগে রিসার্চ শুরু করিনি। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার ঠিক সেদিন থেকেই শুরু করেছি। এক মাসের মধ্যে একটা মোটামুটি কাজের শর্টলিস্ট তৈরি করতে পেরেছিলাম। আমার ম্যান্ট্রা ছিলো একটাই — আমার কোর্স আমার থেকে ভালো কেউ খুঁজতে পারবে না, কারণ কেউ আমার চেয়ে বেশি সময় দেবে না।

রিসার্চের সময় যা যা করেছি:

  • প্রতিটি কোর্সের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে গিয়ে Admission Requirement শব্দে শব্দে পড়া।
  • VPD (Vorprüfungsdokumentation) এর ন্যূনতম রিকোয়ারমেন্ট চেক করা।
  • কারিকুলাম পড়ে বুঝা যে কোর্সটার সাথে আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো ম্যাচিং আছে কিনা।
  • Selection Procedure সেকশনটা ভালো করে পড়া — কারণ এখানেই লুকিয়ে থাকে আসল স্ট্র্যাটেজি।
  • ফ্যাকাল্টি প্রোফাইল দেখে বুঝা যে কারা রিসার্চ করছেন এবং তাদের সাথে আমার ইন্টারেস্টের কোনো মিল আছে কিনা।

ধাপ ২: রিয়েলিটি বোঝা ও স্ট্র্যাটেজি তৈরি — VPD সমস্যা ও সমাধান

শর্টলিস্ট তৈরির সময় যা সবচেয়ে বেশি ধাক্কা দিয়েছে তা হলো VPD-এর ন্যূনতম রিকোয়ারমেন্ট। আমার প্রথম ফাইন্ডিংস ছিলো — সর্বোচ্চ কোর্সের ন্যূনতম VPD রিকোয়ারমেন্ট ২.৫, যা আমার ছিলো না। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি — খুবই কম কোর্স আছে যারা ২.৫-এর কম VPD-তে আবেদন গ্রহণ করে। আর আবেদন গ্রহণ মানে অফার লেটার নয় — এই দুটো জিনিস পুরোপুরি আলাদা।

যেহেতু আমার CGPA দিয়ে সরাসরি কোনো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবো না, তাই আমার ফোকাস শিফট করতে হয়েছে। শর্টলিস্টের প্রতিটি কোর্সের Selection Process বেশ কয়েকবার পড়লাম। সেখান থেকে একটা ক্লিয়ার আইডিয়া পেলাম যে ইউনিভার্সিটিগুলো কী দেখে সিলেকশন করে। সেখান থেকে তিনটি মূল পয়েন্ট বের করলাম যেগুলো আমার কাছে কাজে লাগতে পারে:

  • IELTS ন্যূনতম ৭.০০: বেশিরভাগ কোর্সে ৬.৫ চাইলেও ৭.০ থাকলে অ্যাপ্লিকেশনে একটা পজিটিভ ইমপ্যাক্ট পড়ে।
  • জার্মান ভাষার সার্টিফিকেট: A1/A2 থাকলেও অনেক ইউনিভার্সিটি এটাকে এক্সট্রা পয়েন্ট হিসেবে কনসিডার করে। B1 পর্যন্ত থাকলে তো কথাই নেই।
  • GRE/GMAT স্কোর: এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। যেসব কোর্সে "aptitude test" বা "additional qualification" এর কথা বলা আছে, সেখানে GRE/GMAT স্কোর CGPA-এর ফাঁকটা অনেকটাই পূরণ করতে পারে।

এই তিনটি পয়েন্ট আমার কাছে একটা ক্লিয়ার রোডম্যাপ বানিয়ে দিলো। আমি বুঝতে পারলাম যে CGPA বাড়ানো আমার হাতে নেই, কিন্তু এই তিনটি জিনিস আমি নিজের ইচ্ছায় অর্জন করতে পারি। আর সেটাই আমার মূল স্ট্র্যাটেজি হয়ে দাঁড়ালো।

ধাপ ৩: স্কিল ডেভেলপমেন্ট — একটার পর একটা সিস্টেম্যাটিক্যালি

স্ট্র্যাটেজি ঠিক হয়ে গেলে পরবর্তী কাজ ছিলো সেটা বাস্তবায়ন করা। আমি একসাথে তিনটা জিনিসে হাত দেইনি, বরং সিকোয়েন্স ঠিক করে এগিয়েছি। প্রথমে IELTS, তারপর GMAT, এরপর জার্মান ভাষা। প্রতিটি পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদা সময় বরাদ্দ রেখেছি এবং সেই সময়ের মধ্যে ফোকাসড প্রস্তুতি নিয়েছি।

IELTS প্রস্তুতি (৬ মাস):

ছয় মাস সময় নিয়ে নিয়মিত প্রস্তুতি নিয়েছি। Reading ও Listening-এ প্র্যাকটিস টেস্ট দিয়েছি প্রায় প্রতিদিন। Writing ও Speaking-এ নিজের দুর্বলতা বুঝতে পেরে সেখানে বেশি সময় দিয়েছি। টার্গেট ছিলো ৭.০ — অর্জন করতে পেরেছিলাম। এখানে একটা কথা বলি — IELTS শুধু স্কোরের জন্য না, এটা তোমার academic English এর ফাউন্ডেশন শক্ত করে যা পরে SOP লেখা এবং ইন্টারভিউতে কাজে লাগে।

GMAT প্রস্তুতি (৬ মাস):

IELTS শেষ করে সরাসরি GMAT-এ নেমেছি। এটা ছিলো আমার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং পার্ট। Quantitative ও Verbal দুটো সেকশনেই ভালো প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩-৪ ঘণ্টা দিয়েছি। GMAT-এর একটা বড় সুবিধা হলো — এটা তোমার analytical ability প্রমাণ করে, যা অনেক জার্মান ইউনিভার্সিটি CGPA-এর বিকল্প হিসেবে দেখে। Job Done!

জার্মান ভাষা (এপ্রিল ২০২৫ থেকে চলমান):

Goethe-Institut-এ ভর্তি হয়েছি এপ্রিল ২০২৫-এ। যদিও এখনো B1 পাশ করতে পারিনি, কিন্তু A1 ও A2 সার্টিফিকেট অ্যাপ্লিকেশনে জমা দিয়েছি। জার্মান ভাষা শেখার পেছনে আমার মূল উদ্দেশ্য ছিলো দুটো — প্রথমত, অ্যাপ্লিকেশনে এক্সট্রা পয়েন্ট পাওয়া; দ্বিতীয়ত, জার্মানিতে গিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম জবের সুযোগ বাড়ানো। জার্মান ভাষা জানলে জার্মানির জব মার্কেটে তোমার ভ্যালু অনেক বেড়ে যায়, এটা কোনো গোপন কথা না।

ধাপ ৪: প্রথম আবেদন ও প্রথম অফার — বিশ্বাসের জয়

জানুয়ারি ২০২৫-এ প্রথম আবেদন করলাম TU Bergakademie Freiberg (TUBAF)-এ। এই ইউনিভার্সিটি বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলো — তাদের VPD রিকোয়ারমেন্ট তুলনামূলকভাবে কম ছিলো, কারিকুলামে আমার ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে ম্যাচিং ছিলো, এবং Selection Procedure-তে অ্যাপটিটিউড টেস্ট ও ল্যাঙ্গুয়েজ স্কিলকে গুরুত্ব দেওয়া ছিলো।

আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হয়েছে। এই এক মাস ছিলো মানসিকভাবে খুব কঠিন — প্রতিদিন মেইল চেক করা, ফোরাম দেখা, অন্যদের অফার পাওয়ার পোস্ট দেখা। অবশেষে যখন অফার লেটারটা ইনবক্সে এলো, নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার তো একটা অফারের দরকার ছিলো — সেটা Done! ✌️

প্রথম অফারটা শুধু একটা অফার নয়, এটা আমার পুরো স্ট্র্যাটেজির প্রমাণ যে আমার পথটা ভুল না। এই একটা অফার আমাকে পরবর্তী সব আবেদনে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

ধাপ ৫: কনফিডেন্স বাড়িয়ে ব্যাপক আবেদন — ৯টি অফার, ৮টি রিজেকশন

প্রথম অফারের পর কেন যেন কনফিডেন্স অনেক বেড়ে গেল। HTW Berlin-এ আবেদন করলাম — Accepted ✌️। এরপর আর পিছন ফিরে তাকাইনি। প্রায় ১৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছি (৯টি Accepted, ৮টি Rejected)। রিজেকশন পাওয়াটা কোনো ব্যাপার না — কারণ আমি জানতাম আমার CGPA কম, তাই কিছু রিজেকশন আসবেই। আমার ফোকাস ছিলো অফারগুলোতে।

অফার পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ:

  • TU Bergakademie Freiberg (TUBAF)
  • HTW Berlin
  • Trier University
  • Leuphana University Lüneburg
  • Ulm University
  • University of Hohenheim
  • Osnabrück University
  • Goethe University Frankfurt
  • TU Darmstadt

এই লিস্টটা দেখলে বোঝা যায় যে TU Darmstadt, Ulm University, Goethe University Frankfurt-এর মতো শীর্ষস্থানীয় ইউনিভার্সিটিগুলোও নিম্ন CGPA সত্ত্বেও অফার দিতে পারে — যদি তোমার প্রোফাইলের অন্যান্য অংশ শক্তিশালী হয়। রিজেকশন নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কারণ জার্মানির সিলেকশন প্রক্রিয়া অনেক কমপ্লেক্স — GPA ছাড়াও অনেক ফ্যাক্টর বিবেচনা করা হয়।

ধাপ ৬: চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, এনরোলমেন্ট ও ভিসা

৯টি অফারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যেটা আকর্ষণ করেছিলো সেটা হলো TU Darmstadt-এর Logistics & Supply Chain প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামটি বেছে নেওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ ছিলো — কোর্স স্ট্রাকচার অনেক শক্তিশালী, ইন্ডাস্ট্রি কানেকশন ভালো, লোকেশন Darmstadt শহরটি ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছাকাছি যা জবের সুবিধা দেয়, এবং TU Darmstadt জার্মানির একটি স্বনামধন্য TU9 ইউনিভার্সিটি।

Enrollment প্রক্রিয়াটিও যথেষ্ট সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করেছি। সব ডকুমেন্ট আগে থেকেই রেডি রেখেছিলাম বলে কোনো সমস্যা হয়নি। এরপর ভিসা আবেদনের প্রস্তুতি নিলাম — ফাইন্যান্সিয়াল ডকুমেন্ট, মোটিভেশন লেটার, হেলথ ইন্স্যুরেন্স সবকিছু আগে থেকেই গুছিয়ে রেখেছিলাম। ডিসেম্বরে ভিসা হাতে পেলাম।

একটা বিষয় পরিষ্কার করে বলি — আমার জার্নিতে কোনো শর্টকাট ছিলো না। প্রতিটি ধাপে সময় দিয়েছি, প্রতিটি ডকুমেন্ট নিজে তৈরি করেছি, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছি। কনসালট্যান্টের উপর নির্ভর করিনি। আর এটাই আমার মতে সবচেয়ে বড় পাওয়া — নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।

আমি যেহেতু জার্মান ভিসা পেয়েছি, আমার বিশ্বাস একটাই — CGPA যাই থাকুক, সবাই যদি স্ট্র্যাটেজিকভাবে আগে থেকে সব কাজ একটু একটু করে এগিয়ে যায়, তাহলে অবশ্যই অন্য স্কিল দিয়ে একটা স্কিলের কমতি ওভারকাম করতে পারবে। IELTS, GMAT, জার্মান ভাষা — এই জিনিসগুলো শুধু সিভি সুন্দর করে না, এগুলো তোমাকে একজন সম্পূর্ণ প্রফেশনাল হিসেবে গড়ে তোলে। হাল ছাড়ো না, প্ল্যান করো, কাজ করো — ফলাফল আসবেই।

লেখক Md. Rafsan

মো. রাফছান একজন লেখক, কলামিস্ট, সংগঠক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স-এর শিক্ষার্থী এবং তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি-র প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমতা ও মানবিকতা-ভিত্তিক সমাজ গড়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন