প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার দোলাচলে তিস্তা প্রকল্প
তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণ। এই নদীই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী,
বিগত বছরগুলোতে পর্যাপ্ত পানির আভাবে ২৪০ বছরের পুরোনো তিস্তা শুধু নাব্যতাই হারায়নি, বরং এর তলদেশ ভরাট হওয়ার কারণে কমে গিয়েছে নদীর পানি ধারণের ক্ষমতাও। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ৫ হাজার কিউসেক হওয়ার কথা থাকলেও ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০০ কিউসেকে, ফলে প্রতি বছর ব্যাহত হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। তিস্তা অববাহিকায় শুধু কৃষিই নয়, নদীর শুকিয়ে যাওয়ায় বিলীন হয়েছে মাছের অভয়াশ্রম এবং বন্ধ হয়ে গেছে নদী-নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা। এর প্রভাবে চরম সংকটে পড়েছে জেলে ও মাঝিসহ তিস্তা পাড়ের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা। রিভারাইন পিপলের গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবনে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা, এছাড়াও বাড়ছে বাস্তুভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যাও। বর্ষাকালে ঘন ঘন বন্যা, পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ নদীভাঙন, আর শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকটে ফসল উৎপাদনে বিপত্তির কারণে বহুবছর ধরে ভোগতে থাকা এই প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠ থেকেই এবার উঠে এসেছে, “জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই” আহ্বান।
গত ১৬ ও ১৭ অক্টোবর, তিস্তা অববাহিকার প্রায় ১০৫ কিলোমিটার জুড়ে মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। নদীর দুই তীরে, চরাঞ্চলে, রাস্তার মোড়ে কৃষক, জেলে, ছাত্র নির্বিশেষে অত্র অঞ্চলের কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা এই মশাল মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেয়, দাঁড়ায় প্রতিবেশি দেশের নিয়ন্ত্রিত জল প্রবাহের বিরুদ্ধে। তাদের সবার মুখে একটাই কথা, "নদী বাঁচলে বাঁচবে জীবন"। এর আগে গত ১৭ ও ১৮ ফেব্রুয়ারি তিস্তার দুই তীরে পাঁচ জেলার ১১টি পয়েন্টে একযোগে অবস্থান কর্মসূচি পালন, ৫ অক্টোবর জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি পাঠানোসহ ৯ অক্টোবর উপজেলা শহরগুলোতে গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলন’ এর সূত্রে জানা যায়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গত ৬ ফেব্রুয়ারি রংপুরের কাউনিয়ায় তিস্তাপাড়ে এক গণশুনানিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা’র কাজ শুরু করার আশ্বাস দেন। তার ভাষ্যমতে, ১০ বছরের মেয়াদে দুই ধাপে বাস্তবায়িত এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ধাপে ৫ বছরে ৯ হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীন থেকে ঋণ হিসেবে এবং বাকি ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা প্রদান করা হবে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৮৩ সালে তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি হলেও তা সুনির্দিষ্টভাবে কার্যকর হয়নি, ২০০৭ সালে বাংলাদেশ পানির ৮০ শতাংশ সমানভাবে ভাগ করার প্রস্তাব দিলেও অনুমোদন দেয়নি ভারত। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হয়নি, ২০১৪ সাল থেকে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করলে নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্
৩১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই তিস্তার গল্প ভারত-বাংলাদেশের জলবণ্টন রাজনীতির গল্প, সরকার ২০২১ সালে “তিস্তা মহাপরিকল্পনা” তৈরি করে, যাতে নদী পুনরুদ্ধার, বাঁধ মেরামত, ড্রেজিং এবং কৃষি উন্নয়নের মহা পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু চার বছর কেটে গেলেও কাজ শুরু হয়নি। রাজনৈতিক টানাপোড়েন, বিদেশি অর্থায়নের জট, আর আমলাতান্ত্রিক ধীরগতিতে প্রকল্পটি এখন কাগজেই আটকে আছে। তিস্তা বাঁচানো শুধু নদী পুনরুদ্ধার নয়, এটি আমাদের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। প্রথমত, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল কৃষিনির্ভর। সেখানে পানির ন্যায্য ভাগ না পেলে খাদ্য নিরাপত্তাই হুমকির মুখে পড়বে। দ্বিতীয়ত, তিস্তা অববাহিকার ৩০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এই নদীর উপর নির্ভরশীল। নদী মারা গেলে, তারা বাস্তুচ্যুত হবে, যেমনটা ইতিমধ্যে অনেকে হয়েছে। তৃতীয়ত, এটি আমাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও বটে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মানে এই নয় যে, জনগণের জীবনবিষয়ক অধিকার বিসর্জন দিতে হবে।
সমাধান একটাই, রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার বদলাতে হবে। তাই বিদেশি সহায়তার অপেক্ষা না করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তিস্তা নদী ঘিরে পানির অভাব ও ভাঙনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে, পাশাপাশি নদীর অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক গুরুত্ব পূর্ণভাবে নিশ্চিত করা যাবে। স্থানীয় পর্যায়ে নদী তীর সংরক্ষণ, বিকল্প সেচব্যবস্থা, এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন, এই তিনটি উদ্যোগ একসঙ্গে চালাতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভারত–বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে; পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। একটি নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন শুধু পানি হারায় না, হারায় ইতিহাস, হারায় ভাষা, হারায় তার প্রাণ, তিস্তা আজ সেই সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। তাই আজকের ডাক, "জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই"। এই ডাক নদীর জন্য নয়, আমাদের তিস্তা পাড়ের মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, কারণ, নদী হারালে আমরা নিজেরাই হারিয়ে যাব, হারিয়ে যাবে এই অঞ্চলের মানুষের গৌরবময় অতীত, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।
মো. রাফছান,
কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী
শিক্ষার্থী, মেরিন সায়েন্সেস, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: rafsanraj.cu@gmail.com
আমার দেশের ওয়েব সাইটে পড়তে ঃ https://www.dailyamardesh.com/op-ed/amdoejeetu9uy

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন