ফুটবলের নবজাগরণ : বিশ্বজয়ের হাতছানি




ফুটবলের নবজাগরণ : বিশ্বজয়ের হাতছানি

ষাট-সত্তরের দশকে যেখানে ঢাকা স্টেডিয়াম কাঁপত মোহামেডান-আবাহনীর দ্বৈরথে, আজ সেই মাঠে কেবলই নিস্তব্ধতা। একদিকে ক্রিকেটের উত্থান, অন্যদিকে অব্যবস্থাপনা আর অবহেলিত অবকাঠামোর বোঝা হয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের ফুটবল। অথচ একটা সময় ফুটবল ছিল বাংলাদেশের মানুষের আনন্দ, বেদনার আত্মপ্রকাশের অন্যতম মাধ্যম, স্থানীয় ফুটবল ক্লাবগুলো ছিল পাড়া-মহল্লার বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। বিগত কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অধারাবাহিকতা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব পুরো সিস্টেমকে বিকল করে দিয়েছে। বর্তমন সময়ে লিগ ব্যবস্থা যেমন এলোমেলো, তেমনি নেই খেলোয়াড় তৈরি বা পাইপলাইন গড়ে তোলার কোনো নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াস। জাতীয় দলে ঠিকমতো সুযোগ না পেয়ে হারিয়ে যাচ্ছে ভালো খেলোয়াড়রা। 

অন্যদিকে ক্লাব ফুটবলে বিদেশিদের দাপটে স্থানীয় ফুটবলারদের উন্নয়নের সুযোগ হচ্ছে আরও সীমিত। ফুটবলের মতো এমন জনপ্রিয় একটা খেলায় ব্যবস্থাপনার এই গাফিলতি দেশের ফুটবল ভবিষ্যতকে অনিশ্চিত করে তুলছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের উন্নয়ন পরিকল্পনার অভাব নেই কাগজে-কলমে। কিন্তু মাঠে তার প্রতিফলন কোথায়? বয়সভিত্তিক লিগ নেই, পেশাদার কোচিং কাঠামো নেই, রেফারিদের প্রশিক্ষণ নেই। এদিকে প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভারত, এমনকি ভুটান পর্যন্ত নিজেদের ফুটবলে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কৌশলের প্রয়োগ শুরু করে দিয়েছে। 

জেলা লিগ বন্ধ, মাঠ নেই, স্পন্সর নেই। ঢাকা কেন্দ্রিক ফুটবল ব্যবস্থাপনা একটা নির্দিষ্ট চক্রের হাতে বন্দি। ক্লাবগুলোর মধ্যে নেই প্রতিযোগিতা, নেই পরিকল্পনা। অথচ গ্রামগঞ্জে, ছোট শহরে ফুটবলের জন্য মুখিয়ে আছে একটা গোটা প্রজন্ম। তারা শুধু একটা সুযোগ চায়, দেশের হয়ে মাঠে নামতে চায়, নিজেদের প্রমাণ করতে চায়। যদিও হতাশার আবরণ ঘন, তবুও কিছু সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা আশার আলো দেখা যাচ্ছে। সদ্য সমাপ্ত বেশ কয়েকটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ জাতীয় দলসহ বয়স ভিত্তিক দলগুলো লড়াকু পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। বয়সভিত্তিক দলগুলো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে নিয়মিত, কিছু একাডেমি; বিশেষত বসুন্ধরা কিংস, বিকেএসপি ও সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব তুলে আনছে নতুন প্রতিভা। 

প্রবাসী বাঙালি ফুটবলারদের উত্থানের ফলে বাংলাদেশের ফুটবলে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা কানাডায় বেড়ে ওঠা এই তরুণেরা ফুটবলের আধুনিকতা, পেশাদারিত্ব আর কৌশলগত সচেতনতা নিয়ে এসেছেন আমাদের মাঠে। তাদের কেউ কেউ বিদেশের বড় বড় একাডেমিতে অনুশীলন করেছেন, কেউ প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন, কেউ খেলছেন কানাডিয়ান লিগ, এরা সবাই এখন লাল-সবুজের জার্সি গায়ে চাপিয়ে খেলবেন বাংলাদেশের হয়ে। তারিক কাজী, জামাল ভূঁইয়ারা কেবল খেলোয়াড় নয়, তারা নতুন দিনের প্রতিনিধি, যারা দেখিয়ে দিচ্ছেন বাংলাদেশের ফুটবলের সম্ভাবনা কতটা বিস্তৃত। 

এই বাঙালি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়েরা যেন আমাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছেন। বিভিন্ন দেশের লিগে খেলা বাঙালি তরুণেরা এখন বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। সম্প্রতি দলের সাথে যুক্ত হওয়া সামিত সোম দলের মিডফিল্ডে ভারসাম্য তৈরি করবেন। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে খেলা হামজা চৌধুরীর আগমনের ফলে মাঝ মাঠ আর রক্ষণভাগেও আসবে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। একইভাবে, কিউবা মিসেল ও সুলিভান ব্রাদার্সরা ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ডের ট্রেনিং নিয়ে বেড়ে উঠেছে। তাদের শরীরী ভাষা, খেলার গতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা আমাদের স্থানীয় খেলোয়াড়দের জন্য হতে পারে বড় অনুপ্রেরণা। তাদের অন্তর্ভুক্তি কেবল মাঠে সাফল্য এনে দেবে না, বরং দেশের ফুটবলের ভাবমূর্তিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উজ্জ্বল করবে।

এই পরিবর্তনের জন্য একটি সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি; রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো মজবুত করা এবং গ্রাসরুট পর্যায়ের তরুণ ফুটবলারদের সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূলের স্কুল লিগকে আবার শক্তিশালী করতে হবে। জেলা পর্যায়ে মাঠ এবং প্রশিক্ষক বাড়াতে হবে। ক্লাব ফুটবলে স্থানীয়দের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। প্রবাসী খেলোয়াড়দের যেন সিস্টেমে সহজে যুক্ত করা যায়, সেই ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি জাতীয় দল সহ বয়সভিত্তিক দলগুলোতে নিয়োগ দিতে হবে মানসম্মত কোচিং প্যানেল। বর্তমান সময়ে ফুটবল কেবলই বিনোদনের মাধ্যম নয়; একটি সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বাংলাদেশের ফুটবল আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন, ফুটবলের নবজাগরণ এখন কেবলই সময়ের অপেক্ষা।

মো. রাফছান,
শিক্ষার্থী, মেরিন সায়েন্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: rafsan.cu.ac@gmail.com
ফোন: 01859569175

লেখক Md. Rafsan

মো. রাফছান একজন লেখক, কলামিস্ট, সংগঠক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স-এর শিক্ষার্থী এবং তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি-র প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমতা ও মানবিকতা-ভিত্তিক সমাজ গড়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন