কোটাব্যবস্থার যৌক্তিক সংস্কার চাই

সেয়ার: 0
কোটা সংস্কার আন্দোলন

কোটা সংস্কারের দাবি ও ছাত্র আন্দোলন

মেধার অবমূল্যায়ন ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম

বাংলাদেশে কোটাব্যবস্থা মূলত প্রান্তিক, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য চালু করা হয়েছিল। পরবর্তিতে অসংখ্যবার তার পরিবর্তন, পরিমার্জনের ফলে বর্তমানে এটি একটি বিতর্কিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোটার পরিমাণ বৃদ্ধির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে।

ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সরকারি চাকরি এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে ১৯৭২ সাল থেকেই চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা, জেলা ও নারী কোটা ছিল। তৎকালীন সরকার ১৯৭২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর একটি নির্বাহী আদেশ জারি করে। প্রাথমিকভাবে, এতে নারীদের, জাতিগত সংখ্যালঘুদের এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য কোটা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সময়ের সাথে সাথে, সিস্টেমটি সম্প্রসারিত হয়, যার ফলে বিভিন্ন সরকারি চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অংশই এখন এই কোটার আওতাভুক্ত।

বর্তমান কোটার বণ্টন

বাংলাদেশের প্রশাসনিক এবং শিক্ষা খাতে প্রায় ৫৬% সরকারি চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন বিভিন্ন কোটার অধীনে সংরক্ষিত। এতে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের জন্য সংরক্ষিত আছে ৩০%, নারীদের জন্য ১০%, পশ্চাদপদ এলাকার জন্য ১০%, জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য ৫%, এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত আছে ১% কোটা।

মেধার অবমূল্যায়ন

কোটাব্যবস্থার অন্যতম উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব হল মেধাবী শিক্ষার্থীদের মেধার অবমূল্যায়ন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের একটি গবেষণায় দেখা যায়, কেবলমাত্র ৪৪% সরকারি চাকরিতে মেধার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে। যা ছাত্রদের মধ্যে হতাশা এবং অসন্তোষ সৃষ্টি করে, এটি তাদের পরিশ্রম এবং কৃতিত্বের জন্য এক বিরাট অবমাননা।

বৈষম্য ও সামাজিক অসন্তোষ

কোটাব্যবস্থা, সমতার প্রচারের বিপরীতে, অনিচ্ছাকৃতভাবে একটি বৈষম্যকে উৎসাহিত করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৭২% শিক্ষার্থী কোটাব্যবস্থাকে অন্যায় মনে করে এবং তারা অনতিবিলম্বে এর যৌক্তিক সংস্কার চায়। নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রতি এই বৈষম্যমূলক আচরণ সামাজিক সংহতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।

আন্দোলন ও প্রতিবাদ

কোটাব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন দেশব্যাপী তীব্রতর অবস্থায় চলমান রয়েছে। আন্দোলনের গতি কমাতে রাস্তায় নেমেছে পুলিশ, বিজিবি এবং ছাত্রলীগ। তীব্র আন্দোলনের মুখে পুলিশ, বিজিবির গুলি, টিয়ারগ্যাস ও গ্রেনেড হামলার ফলে ইতোমধ্যেই ৬ জন ছাত্র নিহত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী।

সংস্কারের দাবি

তরুণ সমাজ মনে করে, তৎকালীন সময়ে কোটাব্যবস্থার প্রয়োজন থাকলেও বর্তমানে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কোটার বরাদ্ধকৃত অংশ কমিয়ে সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার পাশাপাশি তারা চায় তাদের মেধাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মত একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিস্টেম। বিভিন্ন গবেষণা এবং পরিসংখ্যান ছাত্রদের এই অভিযোগগুলিকে সমর্থন করে।

মেধা ও কোটার ভারসাম্য বজায় রেখে, বাংলাদেশ আরও সময়োপযোগী এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে এচিরেই এই অস্থিতিশীল দূরাবস্থার সমাধান হবে।

লেখক Md. Rafsan

মো. রাফছান একজন লেখক, কলামিস্ট, সংগঠক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স-এর শিক্ষার্থী এবং তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি-র প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমতা ও মানবিকতা-ভিত্তিক সমাজ গড়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন