স্পাইরুলিনা: মাছের খাদ্যে প্রাকৃতিক সুপারফুড
প্রায় ৮.২ বিলিয়ন মানুষের এই ছোট্ট পৃথিবীতে মৎস্যচাষ আধুনিক কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত সামুদ্রিক মাছ আহরণ, মাছ চাষে খাদ্য বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়, পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মানুষের নিত্যদিনের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে কেবল মাছের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; মাছের পুষ্টিমান, স্বাস্থ্য ও চাষের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে প্রস্তুতকৃত মাছের খাদ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাছের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়, যার অধিকাংশই আসে সামুদ্রিক মাছ থেকে, মাছের খাদ্যের অন্যান্য উপাদানও ব্যয়বহুল, অপেক্ষাকৃত কম নিরাপদ। এতে একদিকে যেমন সামুদ্রিক মাছের মজুত হ্রাস পাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে মাছের খাদ্যের সামগ্রিক ব্যয়, অতিরিক্ত খাদ্য উপাদান ব্যবহারের ফলে নষ্ট হচ্ছে জলজ বাস্তুতন্ত্র।
এই প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক ‘সুপারফুড’ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে মৎস্যচাষিদের কাছে স্পাইরুলিনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে, এবং এর উৎপাদনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। মূলত এটি একটি সর্পিলাকার নীলাভ-সবুজ শৈবাল, যা কেবল মানুষের জন্যই উপকারী নয়, মাছের জন্যও এক অমূল্য সম্পূরক খাদ্য, অত্যন্ত পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি কার্যকর উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, এই শৈবালে প্রোটিনের ঘনত্ব প্রায় ৫৫–৭০%, যা চাষের মাছের পেশি গঠন ও দৈহিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্যমতে, কোষপ্রাচীর সেলুলোজমুক্ত হওয়ায় মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই মানবদেহে স্পাইরুলিনার ৮৫ শতাংশের বেশি প্রোটিন শোষিত হয়।
স্পাইরুলিনায় রয়েছে ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৬, বি-১২, ভিটা
চাষকৃত মাছ সাধারণত প্রাকৃতিক উৎসের মাছের তুলনায় রঙ ও স্বাদে কিছুটা কম আকর্ষণীয় হয়; স্পাইরুলিনা এই ঘাটতি পূরণ করে মাছের রঙ, স্বাদ ও পেশির মান উন্নত করে। বিশেষ করে স্যামন, ট্রাউট ও অন্যান্য রঙিন মাছের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাছাড়া, এই শৈবাল পুকুর বা অ্যাকুয়ারিয়ামের ফাইটোপ্ল্যাঙ্
সাধারণত জারুক মিডিয়া ব্যবহার করে পুকুর বা রেসওয়ে পদ্ধতিতে অ্যারেটর বা প্যাডেল হুইল ব্যবহারের মাধ্যমে স্পাইরুলিনা চাষ করা যায়। কম জায়গা, স্বল্প খরচ এবং সহজ উৎপাদন প্রক্রিয়াই স্পাইরুলিনাকে মাছের বিকল্প খাদ্য হিসেবে মৎস্যচাষিদের কাছে দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পাইরুলিনা চাষের জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রা ২৮–৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, pH ৭–১১, উত্তম লবণাক্ততার মাত্রা ২০–২৫ পিপিটি এবং দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ ৫–৬ মিলিগ্রাম বজায় রাখলে সর্বোচ্চ উৎপাদন পাওয়া যায়। তবে জারুক মিডিয়া খানিকটা ব্যয়বহুল হওয়ায় স্বল্প খরচে উন্নত বিকল্প পদ্ধতি উদ্ভাবনে কাজ করছে দেশের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্
স্পাইরুলিনার ব্যবহার শুধু মাছ চাষেই সীমাবদ্ধ নয়, চিংড়ি চাষেও এর কার্যকারিতা প্রমাণিত। এটি চিংড়ির দ্রুতবৃদ্ধি, উচ্চ সারভাইভাল রেট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পাশাপাশি স্পাইরুলিনা পুকুরের তলদেশে জৈব পদার্থের জমা কমায়, পানির স্বচ্ছতা ও রঙ উন্নত করে, যা পানির গুণগত মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এটি পুকুরের জৈব ভারসাম্য বজায় রেখে দীর্ঘমেয়াদে মাছ চাষের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর ও টেকসই পরিবেশ নিশ্চিত করে। এছাড়া স্পাইরুলিনা মাছের প্রজনন ক্ষমতা বৃদ্ধিতেও কার্যকর। খাদ্যে এই শৈবাল মিশ্রিত করলে মাছের প্রজনন হার বাড়ে এবং উৎপাদিত ডিম ও পোনা হয় অধিক গুণগত মানসম্পন্ন। এর মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, লিনোলিক ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মাছের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও বৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। গবেষণায় দেখা গেছে, স্পাইরুলিনা-সমৃদ্ধ খাদ্য ব্যবহারে মাছের লোহিত ও শ্বেত রক্তকণিকা, হিমোগ্লোবিন এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ৫০টি গবেষণা ও ২৬টি মাছের প্রজাতির ওপর পরিচালিত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাছের খাদ্যে মাত্র ০.০২৫% স্পাইরুলিনা সংযুক্ত করলে মাছের দৈহিক বৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। বিশেষত তেলাপিয়া প্রজাতিতে ৫% স্পাইরুলিনা মিশ্রিত খাদ্য ব্যবহারে মাছের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার হার দাঁড়ায় প্রায় ৮৭%, যা মৎস্যচাষে একটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ও মৎস্য গবেষকদের মতে, মাছের খাদ্যের জন্য স্পাইরুলিনা একটি সর্বোত্তম সম্পূরক। সঠিক মাত্রায় ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের বিকল্প খাদ্য হিসেবে এটি অর্থনৈতিক, পরিবেশবান্ধব ও স্বাস্থ্যকর সমাধান হিসেবে ইতোমধ্যেই মৎস্যচাষিদের আস্থা অর্জন করেছে। স্পাইরুলিনা কেবল একটি সম্পূরক খাদ্যই নয়; এটি মৎস্যচাষের জন্য একটি প্রাকৃতিক সুপারফুড। মাছের দৈহিক বৃদ্ধি, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, পেশির মান, রঙ ও প্রজনন ক্ষমতা উন্নয়নে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সহযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে স্পাইরুলিনা উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আগ্রহী মাছ চাষিদের জন্য স্পাইরুলিনা উৎপাদন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে সমৃদ্ধ হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি। আগামী দিনগুলোতে মাছের খাদ্যে স্পাইরুলিনা মিশ্রণে অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গড়ে উঠলে অচিরেই দেশের মৎস্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি, স্পাইরুলিনার সুফল সর্বত্র পৌঁছে দিতে প্রয়োজন টেকসই বাজার ব্যবস্থা, সরকারি ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা। ভিশন ২০৪১ ও এসডিজি (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে স্পাইরুলিনা হতে পারে মাছের অন্যতম বিকল্প খাদ্য উৎস, হতে পারে আমাদের মৎস্যখাতে টেকসই উন্নয়নের প্রতীক, একটি নতুন ভরসার নাম।
মো. রাফছান,
কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী
শিক্ষার্থী, মেরিন সায়েন্স, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: rafsanraj.cu@gmail.com

0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন