তিস্তার জল, উত্তরবঙ্গের বেদনা: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক

সেয়ার: 0
তিস্তার জল: উত্তরবঙ্গের বেদনা ও মহাপরিকল্পনা

তিস্তার জল, উত্তরবঙ্গের বেদনা: প্রতিশ্রুতি ও প্রাপ্তির ফারাক

তিস্তা অববাহিকার দুই কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

তিস্তা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রাণ। এই নদীই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার দুই কোটি মানুষের জীবন, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছে। ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদী পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রে মিশে। কিন্তু ভারতের নিয়ন্ত্রিত জলপ্রবাহের কারণে তিস্তা বর্ষায় উন্মত্ত থাকে, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা যায় বিরান শূন্য মরুভূমির মতো চিত্র।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও পানিপ্রবাহের সংকট

বিগত বছরগুলোতে পর্যাপ্ত পানির আভাবে ২৪০ বছরের পুরোনো তিস্তা নাব্যতা হারিয়েছে এবং এর তলদেশ ভরাট হয়ে কমে গেছে পানি ধারণের ক্ষমতাও। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ ৫ হাজার কিউসেক হওয়ার কথা থাকলেও ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের কারণে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০০ কিউসেকে। ফলে প্রতি বছর ব্যাহত হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ফসল উৎপাদন। কখনো বন্যা, কখনো খরা—এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে আছে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ।

অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জনজীবনে প্রভাব

তিস্তা অববাহিকায় শুধু কৃষিই নয়, নদীর শুকিয়ে যাওয়ায় বিলীন হয়েছে মাছের অভয়াশ্রম এবং বন্ধ হয়ে গেছে নদী-নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা। রিভারাইন পিপলের গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি বছর তিস্তার ভাঙন ও প্লাবনে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির মুখে পড়েন উত্তরের ৫ জেলার বাসিন্দা। বাড়ছে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা। এই প্রান্তিক মানুষদের কণ্ঠ থেকেই উঠে এসেছে, “জাগো বাহে, তিস্তা বাঁচাই” আহ্বান।

জনমতের জাগরণ: তিস্তা রক্ষা আন্দোলন

গত ১৬ ও ১৭ অক্টোবর, তিস্তা অববাহিকার প্রায় ১০৫ কিলোমিটার জুড়ে মশাল প্রজ্বলন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। নদীর দুই তীরে কৃষক, জেলে, ছাত্র—নির্বিশেষে কয়েক হাজার মানুষ এই মশাল মিছিলে অংশ নেয়। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান গত ৬ ফেব্রুয়ারি তিস্তাপাড়ে এক গণশুনানিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ শুরু করার আশ্বাস দেন।

চুক্তির ফাঁকে ফাঁকে বঞ্চনার ইতিহাস

দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার পানি ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের একটি জটিল বিষয়। ১৯৮৩ সালে চুক্তি হলেও তা কার্যকর হয়নি। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হয়নি। ২০১৪ সাল থেকে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করলে উত্তরাঞ্চলে বন্যা, খরা ও ভাঙনের ত্রিমুখী সমস্যার সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর উত্তরাঞ্চলের মানুষ নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা: সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা

২০১৬ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী তিস্তার দুই তীরে স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়েছে। চীনের প্রস্তাবিত প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীর গভীরতা প্রায় ১০ মিটার বৃদ্ধি পাবে, বন্যার পানি গ্রামাঞ্চল প্লাবিত করবে না এবং সারা বছর নৌ চলাচলের মতো পানি সংরক্ষণ করা যাবে। এছাড়াও ১০৮ কিলোমিটার নদী খনন, ২২০ কিলোমিটার তীর রক্ষা, সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ইকোনমিক জোনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে ৭–১০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন

তিস্তা বাঁচানো শুধু নদী পুনরুদ্ধার নয়, এটি আমাদের ন্যায়বিচার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল কৃষিনির্ভর, সেখানে পানির ন্যায্য ভাগ না পেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। বিদেশি সহায়তার অপেক্ষা না করে তিস্তা মহাপরিকল্পনার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে। ভারত–বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশনের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে এবং পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে জনগণের জানার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

একটি নদী যখন শুকিয়ে যায়, তখন শুধু পানি হারায় না—হারায় ইতিহাস, হারায় ভাষা, হারায় তার প্রাণ। নদী হারালে আমরা নিজেরাই হারিয়ে যাব, হারিয়ে যাবে এই অঞ্চলের মানুষের গৌরবময় অতীত, ইতিহাস ও ঐতিহ্য।

লেখক Md. Rafsan

মো. রাফছান একজন লেখক, কলামিস্ট, সংগঠক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স-এর শিক্ষার্থী এবং তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি-র প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমতা ও মানবিকতা-ভিত্তিক সমাজ গড়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন