শিক্ষার সংকট: প্রাথমিকের শিক্ষকদের মর্যাদার লড়াই
জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগরদের অনিরাপদ বর্তমান ও অসম মর্যাদার চিত্র
বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষকরা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারিগর। দেশের প্রতিটি গ্রাম, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও শহরের স্কুলে তাঁরা নতুন প্রজন্মকে শুধু অক্ষরজ্ঞানই দিচ্ছেন না, বরং দিচ্ছেন মানবিকতা, নাগরিকত্ব, চিন্তা–চেতনার ভিত্তি। কিন্তু মর্মান্তিক সত্য হলো, যারা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েন, তাদের বর্তমানটাই সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ, অস্থিতিশীল।
আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষকদের আন্দোলন নতুন নয়। ২০১১ সাল থেকে প্রায় নিয়মিতই তারা রাস্তায় নেমে বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। ন্যায্য বেতন, ভাতা বৃদ্ধি, পদমর্যাদা উন্নয়ন, এমনকি জাতীয়করণের দাবিতে অসংখ্য মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি হয়েছে। ২০১৮ সালে আন্দোলন আমরণ অনশনের মতো চরম পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সরকারের সামান্য ছাড়ে তখন আপাত শান্তি নেমে এলেও মূল সমস্যার কোনো সমাধান হয়নি; বঞ্চনার শিকড় রয়ে গেছে পূর্বের মতোই গভীরে।
বেতন কাঠামো ও বৈষম্যের চিত্র
বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা ১৩তম গ্রেডে চাকরি করছেন, যার মূল বেতন মাত্র ১১,০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে সর্বোচ্চ ২৬,৫৯০ টাকায় থামে। প্রধান শিক্ষকরা সম্প্রতি ১০ম গ্রেডে উন্নীত হওয়ায় কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও, সহকারী শিক্ষকরা এখনো নিজেদের "অসম মর্যাদার" মধ্যে বন্দি মনে করছেন। তাদের দাবি, শুরুর গ্রেড কমপক্ষে ১১তম হওয়া উচিত, নইলে জীবনের ন্যূনতম ব্যয়ও মেটানো সম্ভব নয়।
শিক্ষকদের তিন দফা দাবি
অন্যান্য সরকারি কর্মচারীরা যেখানে মূল বেতনের ৪০–৪৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান, প্রাথমিক শিক্ষকরা পান মাত্র ১,০০০–১,৫০০ টাকা। চিকিৎসা ভাতা দেওয়া হয় মাত্র ৫০০ টাকা, যা বাজারদরের প্রেক্ষাপটে প্রায় একটি প্রহসন। ফলে শিক্ষকদের তিন দফা দাবি এখন পরিষ্কার: ১) বাড়িভাড়া ভাতা ন্যূনতম ২০ শতাংশ করা, ২) চিকিৎসা ভাতা বাড়িয়ে ১,৫০০ টাকা করা, ৩) উৎসব ভাতা ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করা।
রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার ও সামাজিক দায়িত্ব
সরকারি মহল থেকে বাজেট সীমাবদ্ধতার যুক্তি তোলা হলেও মূল প্রশ্ন—রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার কোথায়? আরও বেদনাদায়ক হলো, যখন শিক্ষকরা বৈষম্যের বিরুদ্ধে রাস্তায় দাঁড়ান, তখন তাদের স্বাগত জানানো হয় জলকামান, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস দিয়ে। আমরা পাঠ্যপুস্তকে বাদশাহ আলমগীরের গল্প পড়াই, যিনি শিক্ষকের মর্যাদাকে নিজের সন্তানের চেয়েও বড় করে দেখেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে ঠিক তার বিপরীত উদাহরণ স্থাপন করছি।
শিক্ষার মানের ওপর প্রভাব
সমস্যাটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং গভীরভাবে মানসিক। যখন একজন শিক্ষক প্রাত্যহিক ব্যয়ের চাপে ডুবে থাকেন, তখন শ্রেণিকক্ষে তার মনোযোগ, উদ্যম ও সৃজনশীলতার অনেকটাই হারিয়ে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষককে সংকটে রেখে কোনো জাতি কখনোই শিক্ষায় সমৃদ্ধ হতে পারে না।
সমাধানের পথে পাঁচটি ধাপ
সমাধানের জন্য প্রথমত, সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড অবিলম্বে ১১তম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভাতা-নীতির বৈষম্য দূর করে যুক্তিসঙ্গত বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা দিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষা বাজেট বৃদ্ধিতে প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। চতুর্থত, একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন করে দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। সর্বশেষ, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, কারণ শিক্ষককে ছোট করে দেখলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ছোট হয়ে বেড়ে উঠবে।
শিক্ষকদের দাবি কোনো বিলাসী আকাঙ্ক্ষা নয়, এটি মর্যাদার লড়াই। রাষ্ট্র যদি সত্যিই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে চায়, তবে প্রথম শর্ত হলো—যারা শিক্ষা দেন, তাদের মর্যাদা নিশ্চিত করা।
অসাধারণ লিখন। শুভ কামনা
উত্তরমুছুনধন্যবাদ, নিপু।
মুছুন