প্রাকৃতিক সুপারফুড স্পাইরুলিনার সম্ভাবনা



প্রাকৃতিক সুপারফুড স্পাইরুলিনার সম্ভাবনা


মৎস্যচাষ আধুনিক কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত সামুদ্রিক মাছ আহরণমাছ চাষে খাদ্য বাবদ অতিরিক্ত ব্যয়পরিবেশ দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের এই দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে মানুষের নিত্যদিনের প্রোটিন চাহিদা মেটাতে কেবল মাছের উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়মাছের পুষ্টিমানস্বাস্থ্য ও চাষের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণভাবে প্রস্তুতকৃত মাছের খাদ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাছের গুঁড়ো ব্যবহার করা হয়যার অধিকাংশই আসে সামুদ্রিক মাছ থেকেমাছের খাদ্যের অন্যান্য উপাদানও ব্যয়বহুলঅপেক্ষাকৃত কম নিরাপদ। এতে একদিকে যেমন সামুদ্রিক মাছের মজুত হ্রাস পাচ্ছেঅন্যদিকে বাড়ছে মাছের খাদ্যের সামগ্রিক ব্যয়অতিরিক্ত খাদ্য উপাদান ব্যবহারের ফলে নষ্ট হচ্ছে জলজ বাস্তুতন্ত্র।

এই প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক ‘সুপারফুড’ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে মৎস্যচাষিদের কাছে স্পাইরুলিনা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছেএবং এর উৎপাদনেও এসেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। মূলত এটি একটি সর্পিলাকার নীলাভ-সবুজ শৈবালযা কেবল মানুষের জন্যই উপকারী নয়মাছের জন্যও এক অমূল্য সম্পূরক খাদ্যঅত্যন্ত পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ একটি কার্যকর উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছেএই শৈবালে প্রোটিনের ঘনত্ব প্রায় ৫৫–৭০%যা চাষের মাছের পেশি গঠন ও দৈহিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)-এর তথ্যমতেকোষপ্রাচীর সেলুলোজমুক্ত হওয়ায় মাত্র ১৮ ঘণ্টার মধ্যেই মানবদেহে স্পাইরুলিনার ৮৫ শতাংশের বেশি প্রোটিন শোষিত হয়। মজার ব্যাপার হলোস্পাইরুলিনা খাওয়ানো মাছ সাধারণ খাদ্য পাওয়া মাছের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত বড় হয়। শুধু এতটুকুই নয়প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতাও প্রায় ২০–২৫% পর্যন্ত বেড়ে যায়। যে কারণে পুকুরে পানির গুণমান মাঝেমধ্যে খারাপ হলেও মাছ তুলনামূলক নিরাপদ থাকে।

স্পাইরুলিনায় রয়েছে ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৬, বি-১২, ভিটামিন ই, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসসহ নানা প্রয়োজনীয় খনিজপদার্থ,  যা মাছের ফিড কনভার্শন রেশিও (FCR) কমিয়ে উৎপাদন ব্যয়কে সহনীয় পর্যায়ে রাখে। এছাড়া এতে থাকা ফাইকোসায়ানিন নামক রাসায়নিক যৌগ ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ধীর করে এবং এর উচ্চমানের প্রোটিনগুরুত্বপূর্ণ অ্যামাইনো অ্যাসিডভিটামিনখনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মাছের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়মাছের মৃত্যুহার হ্রাস করে কমিয়ে আনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা। চাষকৃত মাছের রঙস্বাদ ও পেশির মান অনেক সময় প্রাকৃতিক উৎসের মতো আকর্ষণীয় হয় না। তবে স্পাইরুলিনা এ ক্ষেত্রে চমৎকার কাজ করে। এর বিটা-ক্যারোটিন মাছের রঙ উন্নত করেপেশি বা ফিলেটকে আরও টেক্সচারসমৃদ্ধ করে তোলে। স্পাইরুলিনা উৎপাদনের বিষয়টিও তুলনামূলক সহজ। পুকুররেসওয়ে কিংবা ছোট ট্যাংকযেখানেই হোকঅ্যারেটর বা প্যাডেল হুইল ব্যবহার করে এটি সহজেই চাষ করা যায়। তাপমাত্রা ২৮–৩৪°C, pH ৭–১১ আর লবণাক্ততা ২০–২৫ ppt হলে উৎপাদন খুব ভালো হয়। অবশ্য জারুক মিডিয়া ব্যবহারে খরচ একটু বেশি। তাই বিকল্পসাশ্রয়ী পদ্ধতি খুঁজে বের করতে গবেষণা চলছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিউট্রি সি ল্যাব’ উদ্ভাবিত NPK ফর্মুলা সেই গবেষণার বড় সাফল্যকারণ এতে ১ কেজি স্পাইরুলিনা উৎপাদন খরচ নেমে আসে প্রায় ১,০৪০ টাকায়যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী।

মাছই নয়চিংড়ি চাষেও স্পাইরুলিনার কার্যকারিতা বেশ চমকপ্রদ। চিংড়ির বৃদ্ধিরোগপ্রতিরোধসারভাইভাল রেটসবকিছুতেই এটি উন্নতি ঘটায়। পাশাপাশি এটি পানির স্বচ্ছতা বাড়ায়পুকুরের জৈব ভারসাম্য বজায় রাখে এবং তলদেশে বর্জ্য জমা কমায়। ফলে দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—স্পাইরুলিনা মাছের প্রজনন ক্ষমতাও বাড়ায়। ডিমের মান ভালো হয়পোনা হয় সবল এবং বেঁচে থাকার হারও বাড়ে। সব দিক বিবেচনায় স্পাইরুলিনা এখন মৎস্যচাষে একটি সম্ভাবনাময়পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক বিকল্প খাদ্য উৎস। তাই জাতীয় পর্যায়ে এর উৎপাদন বাড়ানোসরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ সহযোগিতায় জাতীয় পর্যায়ে স্পাইরুলিনা উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আগ্রহী মাছ চাষিদের জন্য স্পাইরুলিনা উৎপাদন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা এখন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবেঅন্যদিকে সমৃদ্ধ হবে স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতি। আগামী দিনগুলোতে মাছের খাদ্যে স্পাইরুলিনা মিশ্রণে অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় গড়ে উঠলে অচিরেই দেশের মৎস্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে। পাশাপাশিস্পাইরুলিনার সুফল সর্বত্র পৌঁছে দিতে প্রয়োজন টেকসই বাজার ব্যবস্থাসরকারি ঋণ ও আর্থিক প্রণোদনা। ভিশন ২০৪১ ও এসডিজি (SDG) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে এবং সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণে স্পাইরুলিনা হতে পারে মাছের অন্যতম বিকল্প খাদ্য উৎসহতে পারে আমাদের মৎস্যখাতে টেকসই উন্নয়নের প্রতীকএকটি নতুন ভরসার নাম।

মো. রাফছান

কলাম লেখক ও পরিবেশকর্মী

শিক্ষার্থীমেরিন সায়েন্সচট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

লেখক Md. Rafsan

মো. রাফছান একজন লেখক, কলামিস্ট, সংগঠক ও গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্স-এর শিক্ষার্থী এবং তরুণ কলাম লেখক ফোরাম, চবি-র প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তরুণদের সঙ্গে কাজ করছেন। সঠিক তথ্য, সচেতনতা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে একটি সমতা ও মানবিকতা-ভিত্তিক সমাজ গড়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য।

0 Comments:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন