সুন্দরবনের অকথিত গল্প: গবেষণা জরিপের তিন দিন
সুবিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি, পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট, সুন্দরবন। ১০,০০০ বর্গ কিলোমিটারের এই বনের মধ্য দিয়ে জালের মত ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় খাল, আঁকাবাঁকা নদী আর বিচিত্র বৈশিষ্টের গাছপালা, আছে রংবেরং এর পাখপাখালি, অসংখ্য বন্য প্রাণী এবং বিভিন্ন ধরনের মিঠা পানি ও সামুদ্রিক মাছ। সম্প্রতি, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস এর ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সুন্দরবনে একটি গবেষণা জরিপ সম্পন্ন করেছে আমাদের ইনস্টিটিউট এর বেশ কয়েকজন গবেষক।
🗓️ প্রথম দিন: মংলা থেকে আন্দারমানিক
গত ২১ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাত্রা শুরু করে সকাল ৭ টায় আমরা মংলাবন্দরে পৌঁছাই। “পেলিকান” নামের একটি রিসার্চ ভ্যাসেলে নির্দিষ্ট সময়ের যাত্রা বিরতির পর ১ম দিন আমরা মংলা বন্দর থেকে পর্যায়ক্রমে হারবাড়িয়া ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এবং আন্দারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র ভ্রমণ করি। সেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ও বন্যপ্রাণী দেখার পাশাপাশি আমরা উপভোগ করি ঐ দুটো অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। পরে আমরা ঐ অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে গড়ে ওঠা জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করি। রিসার্চ ভ্যাসেলে রাত্রি যাপন করার সময় সমুদ্র উপকূলে রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করার পাশাপাশি আমরা ঐ অঞ্চলগুলোর জীব বৈচিত্র্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি।
🌊 দ্বিতীয় দিন: টাইগার পয়েন্ট থেকে কচিখালি
২য় দিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে আমরা টাইগার পয়েন্ট হয়ে জামতলা সী-বিচ দেখতে যাই। সী-বিচে যাওয়ার পথে হরিণ, বাঘের পাগমার্ক দেখার পাশাপাশি লোনা পানির সুন্দরবনে লবন অসহিঞ্চু জাম গাছ দেখতে পাওয়ার বিষয়টি আমাদের বিস্মিত করেছে। জামতলা সী-বিচ এ আমরা নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে প্রতিনিয়ত রক্ষা করার বিষয়টি ভালো ভাবে লক্ষ করি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জামতলা সমুদ্র সৈকতের উপরিভাগের বালি সুন্দরবনের বিভিন্ন উদ্ভিদের শ্বাসমূলগুলোকে ঢেকে দিয়েছে, ফলে অক্সিজেন স্বল্পতায় মারা যাচ্ছে ঐ অঞ্চলের অসংখ্য লোনাপানির উদ্ভিদ। এরপর ট্রলারে করে কটকায় গিয়ে সেখানকার গাছপালা, বন্যপ্রাণী ও জীব বৈচিত্র্য সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করি। ২য় দিন দুপুরে ডিমের চর সমুদ্র সৈকতে গোসল করে খাওয়া দাওয়া করে সন্ধায় আমরা কচিখালির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে যাই।
🔬 তৃতীয় দিন: করমজল থেকে খুলনা – গবেষণা নমুনা সংগ্রহ
৩য় দিন সকালে আমরা করমজলে কুমির, কচ্ছপ, হরিণের কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র দেখতে যাই এবং সেখানকার জীব বৈচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেই। রাতে আমরা দিনের বেলায় দেখে আসা অঞ্চলগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করি এবং তাদের মধ্যকার পারষ্পারিক সম্পর্ক, বৈপরীত্যের কারণ জানার চেষ্টা করি। এই সম্পূর্ণ যাত্রা পথে আমরা ঘুরে আসা সবগুলো অঞ্চলের বিভিন্ন গাছপালা, প্রাণী ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সাথে তাদের পারস্পারিক মিথঃস্ক্রীয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেছি। এছাড়াও গবেষণা জরিপে আমরা সুন্দরবনের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ নদীপথে ৩৪ টি পয়েন্ট হতে জৈব, ভৌত ও রাসায়নিক গুণগত মান তুলনামূলক পর্যালোচনা করে বিভিন্ন স্থানে উদ্ভিদ ও প্রাণী কণার উপস্থিতির পরিমাণ নির্ণয় করেছি এবং পরবর্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য মাটি ও পানির নমুনা সংগ্রহ করেছি।
⚠️ সুন্দরবনের সংকট: লবণাক্ততা, জলবায়ু ও মানবিক চাপ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার অতিরিক্ত লবণাক্ততা, অধিকাংশ পর্যটকদের বন সম্পর্কিত জ্ঞান স্বল্পতার কারণে সুন্দরবন প্রতিনিয়ত সংকটময় পরিস্থিতিতে উপনিত হচ্ছে। আমরা জেনেছি সুন্দরবনের অতিরিক্ত লবণাক্ততায় বিভিন্ন গাছের উচ্চতা প্রতিনিয়ত ছোট হয়ে আসছে। আর এই অতিরিক্ত লবণাক্ততা থেকে মুক্তির জন্য সুন্দরী গাছের অতিরিক্ত পরিমাণে শ্বাসমূল গঠন এবং আগা মরা রোগের বিষয়টিও আমরা লক্ষ করেছি। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে আছে অসংখ্য সরীসৃপ প্রাণী। বন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে জানা গেছে, ইদানিং কালে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বদৌলতে সুন্দরবনে দিনকে দিন হরিণ ও কুমিরের সংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে বাঘের সংখ্যাও।
🌏 সুনীল অর্থনীতি ও মেরিন সায়েন্সেসের ভূমিকা
সুনীল অর্থনীতির এই আধুনিক যুগে সমুদ্র সম্পর্কিত জ্ঞানকে পৃথিবীর সর্বত্র পৌঁছে দিতে, বিশাল সমুদ্রের মৎস সম্পদ আহরণ, অন্যান্য সমুদ্র সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার যথাযথ ব্যবহার, সমুদ্রের উপরিভাগ এবং তলদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধানের উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সাল থেকে ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস সমুদ্র বিজ্ঞানের উপর পাঠদান করে আসছে। এই গবেষণা জরিপ আমাদের শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি সুন্দরবনের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ কৌশল প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
📝 শেষ কথা: গবেষণার পথে নতুন দিগন্ত
৩য় দিন রাতের খাবার শেষ করে আমরা খুলনা পৌঁছে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে বাস যাত্রা শুরু করি। তিন দিনের এই অভিযান শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, এটি ছিল প্রকৃতির সাথে একাত্ম হওয়া, সংকট চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যৎ গবেষণার পথচার্ট তৈরির এক অনন্য সুযোগ। সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং সমন্বিত উদ্যোগ। আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা হয়তো অনেক বড় পরিবর্তনের সূচনা বহন করবে।
“সুন্দরবন শুধু একটি বন নয় — এটি বাঙালির আবেগ, জীবিকা, আর প্রকৃতির এক অপার বিস্ময়। এর সংরক্ষণ আমাদের সবার দায়িত্ব।”
0 Comments:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন